রংপুরের একই পরিবারের ৪ জনের হত্যাকাণ্ড: নেপথ্যে কোন গভীর ষড়যন্ত্র?


 

রংপুরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার সেই তিনতলা অসম্পূর্ণ ভবনের নিস্তব্ধ রাতটি কেবল একটি পরিবারের রক্তে ভিজে যায়নি, বরং এটি উন্মোচন করেছে গতানুগতিক পুলিশি বয়ানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল মিথ্যার জাল। অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে ঠান্ডা মাথায় খুন করার পর যে কাহিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রচার মাধ্যমগুলোর একাংশ থেকে হাজির করা হয়েছিলো, তা অপরাধবিজ্ঞান বা ফরেনসিক যুক্তির মাপকাঠিতে এক হাস্যকর প্রহসন মাত্র। আফ্রিকান সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবের অমর সৃষ্টি 'থিংস ফল অ্যাপার্ট'-এর উপমার সঙ্গে মিলালে এই পুরো ঘটনাটির রূপ দাঁড়ায় ঠিক উমুফিয়ার সেই অবক্ষয়ের মতো, যেখানে সমাজ ভেতরকার পচন ও নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে বেছে নেয় কিছু সান্ত্বনাদায়ক ও মনগড়া মিথ।


​পুলিশের প্রাথমিক বয়ান অনুযায়ী, স্থানীয় দুই তরুণ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নাকি গভীর রাতে নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে উঠেছিলো। শব্দ পেয়ে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ছাদে গেলে তারা তাঁকে হত্যা করে। এরপর শব্দ শুনে একে একে ছুটে আসা স্ত্রী, কন্যা এবং ছোট ছেলেটিকেও তারা একে একে শেষ করে দেয়। কিন্তু এই পর্যন্ত তো তবুও একটা মাদকাসক্তের আকস্মিক হিংস্রতার গল্প হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যেতো, যদি না এর পরের অংশগুলো নাটকের অতি-নাটকীয়তায় রূপ নিতো। পুলিশ এর মতে, খুনিরা নাকি মার্ডার শেষ করে বাড়ির বাথরুমে আরামসে গোসল সেরেছে, ডাইনিং টেবিল থেকে শসা ও খেজুর বের করে বেশ তৃপ্তি সহকারে খেয়েছে এবং সেখানে বসে আবার আরেক দফা ইয়াবা সেবন করেছে। সাহিত্যের কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে এটি কোনো বাস্তব অপরাধের বিবরণ নয়; এটি হলো ক্ল্যাসিক ডেউয়াস বা ‘ম্যাকগাফিন’-এর মতো এক কৃত্রিম প্লট ডিভাইস, যা সাহিত্যের তাত্ত্বিক পরিভাষায় ‘ডিউস এক্স ম্যাসিনা’ (Deus ex machina) বা গল্পের চাকা জোর করে ঘোরানোর এক সস্তা স্ক্রিপ্ট রাইটিং। একজন মানুষ যখন অতিরিক্ত নেশার বা পিনিকের চোটে একটা নয়, চারটা তাজা প্রাণ হরণ করে, তখন তার মস্তিষ্কের মোটর স্কিল ও হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পায়। সে তখন বাথরুমে গিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে গোসল করার বা ফ্রিজ খুলে ফলমূল খুঁজে খাওয়ার মতো সূক্ষ্ম ও স্বাভাবিক গৃহস্থালি আচরণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই অংশটুকুকে লিঙ্গুইস্টিক ডিসকোর্স অ্যানালাইসিসের মাপকাঠিতে ফেললে বোঝা যায়, এটি অপরাধের প্রকৃত সত্য লুকানোর এক জাস্টিফাইং ইউফেমিজম বা সান্ত্বনাদায়ক বয়ান, যার মধ্যে শতকরা পঁচাত্তর ভাগই হলো মনগড়া ও বানোয়াট প্রোপাগান্ডা।


​পুলিশের গল্পের বেলুনটি সম্পূর্ণ চুপসে যায় যখন তাদের আরেকটি বয়ান সামনে আসে, আসামিরা নাকি নিজেদের উপস্থিতি ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ঢাকতে স্মার্টফোনগুলোকে ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে চুবিয়ে রেখেছিলো। এখানেই সাহিত্যের রিয়ালিজম বা বাস্তবানুগ সাহিত্যের ধারণা হোঁচট খায়। একজন সাধারণ পাড়ার বখাটে মাদকাসক্ত ছেলে কি কখনো জানে যে কেমিক্যালের বিক্রিয়ায় সার্কিট, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ল্যাবরেটরির ডেটা রিকভারি প্রক্রিয়া জটিল করতে হলে ঠিক কীভাবে ডিটারজেন্টে ফোন চুবিয়ে রাখতে হয়? এটি কোনো সাদামাটা অপরাধীর কাজ নয়; এটি ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসের কোনো প্রো-লেভেলের সাইকোপ্যাথিক ভিলেনের স্ক্রিপ্ট। এই যে অপরাধ লুকানোর জন্য কেমিক্যালের ব্যবহার বা ময়নাতদন্তে উঠে আসা চারজনেরই মুখমণ্ডল ও শরীর দাহ্য পদার্থ দিয়ে ঝলসে বা বিকৃত করার চেষ্টা—এগুলো কোনো দিশেহারা ছিনতাইকারীর এলোমেলো কাজ হতে পারে না। এটি মূলত ‘আইডেনটিটি ইরেজার’ বা পরিচয় চিরতরে মুছে ফেলার এক ঠান্ডা মাথার পেশাদার ব্লু-প্রিন্ট। সাহিত্যের ভাষায় একে বলা যায় ‘অ্যাবসার্ড থিয়েটার’ বা এক অদ্ভুত পরাবাস্তব নাটক, যেখানে কুশীলবরা দর্শকদের মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরাতে এমন সব অবাস্তব মোটিফ বা উপাদান ব্যবহার করে, যা মূল সত্যকে আড়াল করে রাখে।


​মাঝখান থেকে পুলিশের এই সাজানো নাটকের গায়ে আরও এক পশলা সংশয়ের কালি মেখে দেয় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের সহজ চলাচল এবং তাদের মধ্যে একজনের গায়ে পুলিশের গেঞ্জি পাওয়ার বিষয়টি। পুলিশ যখন মুগ্ধর বাসায় যায়, তখন সে কোনো দ্বিধা বা পালানোর ব্যাকুলতা না দেখিয়ে নিজেই সিদ্ধার্থকে ডেকে নিয়ে আসে। অপরাধবিজ্ঞানের ক্লাসিক ন্যারেটিভ বলে, খুনিরা কখনো এত নির্ভার ও সাবলীল হতে পারে না। তাদের এই নির্ভার ভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পোশাকের উপস্থিতি ইশারা করে যে, এই ঘটনার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এমন এক কাঠামোগত সুরক্ষার জাল, যেখানে অপরাধের মূল কুশীলবদের আড়াল করার জন্য সামনে বলির পাঁঠা সাজানো হয়েছে।


​দিনশেষে এই পুরো ঘটনাটি আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরে। চিনুয়া আচেবের উপন্যাসে যেমন উমুফিয়ার সমাজ বাস্তবতার চেয়ে স্বস্তিদায়ক মিথকে ভালোবেসে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছিল, তেমনি গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে স্রেফ মাদকাসক্তের পিনিক বা চুরির গল্প বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এক ভয়ানক সামাজিক অবক্ষয়েরই প্রতিচ্ছবি। সেল টাওয়ারের কল ডিটেইল রেকর্ড, মাইক্রো-ট্রেস ডিএনএ প্রফাইলিং এবং আর্থিক ফরেনসিকের শক্ত প্রমাণ ছাড়া এই অন্ধকারের জাল ছেঁড়া অসম্ভব। 


প্রোপাগান্ডা আর গতানুগতিক পুলিশি বয়ানের এই শূন্য ঘরের ফাঁকা আওয়াজকে যদি থামাতে হয়, তবে মিথ্যার মোহ ছেড়ে ফরেনসিক সততার কঠিন আলো জ্বালাতেই হবে, নতুবা এই তাসের ঘর একদিন আমাদের চোখের সামনেই সম্পূর্ণ ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে।


তবে, পুলিশের এই সাজানো গল্প আর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন তদন্তের বিরুদ্ধে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে, স্বাধীন সাংবাদিক এবং আইনি অধিকারকর্মীরা চাইলে তথ্য ও আইনের সঠিক ব্যবহার করে সত্য উদঘাটনের জন্য সুনির্দিষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।


​প্রথমেই, বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ (Right to Information Act) অনুযায়ী নির্দিষ্ট তথ্যের জন্য লিখিত আবেদন করা যেতে পারে। মামলার চলমান তদন্তকে সরাসরি প্রভাবিত না করে (যেমন তদন্তের সংসংবেদনশীল ও গোপনীয় অংশ বাদ দিয়ে)ঘটনাস্থল থেকে কী ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে, তার জব্দতালিকা (Seizure List) এবং ময়নাতদন্ত রিপোর্টের সারসংক্ষেপ তলব করা সম্ভব। এই আইনি পথ ধরে সিআইডি (CID), পিবিআই (PBI) কিংবা সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক ল্যাবগুলোর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদনের অনুলিপির জন্যও আবেদন করা যায়, যা প্রমাণ করবে যে ডিএনএ বা কেমিক্যাল রেসিডিউয়ের মতো সংবেদনশীল আলামতগুলো আদৌ আইনসম্মতভাবে ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না।


​এই প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের পাশাপাশি গতানুগতিক পুলিশি তদন্তের ওপর থেকে অনাস্থা তৈরি হলে আইনি নোটিশ এবং বিচারিক তদন্ত বা জুডিসিয়াল ইনকোয়ারির (Judicial Inquiry) দাবি তোলার সুযোগ থাকে। মানবাধিকার সংগঠন বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিচারিক তদন্ত চেয়ে আবেদন করা যায়। একই সাথে, ডিটারজেন্টে চুবানো ফোন বা শরীরে কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে পুড়ে যাওয়া আংশিক অংশগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো যেন কোনোভাবেই নষ্ট বা গায়েব করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি নোটিশ পাঠানো যেতে পারে।


​তদন্ত প্রক্রিয়ায় আরও গভীর স্বচ্ছতা আনতে দেশ ও বিদেশের স্বাধীন ফরেনসিক ও ক্রাইম সিন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে পরিবার বা আইনজীবীদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকলে, ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি নিয়ে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে অভিজ্ঞ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় বা স্বাধীন ময়নাতদন্তের আবেদন করা যায়। এর পাশাপাশি, দেশি-বিদেশি স্বাধীন প্যাথলজিস্ট ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের প্যানেল গঠন করে পুলিশের দাবিগুলোকে টেকনিক্যাল ও সায়েন্টিফিক উপায়ে ক্রস-চেক করা এবং লজিক্যাল ত্রুটিগুলো জনসমক্ষে জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব।


​সর্বোপরি, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের বাইরে গিয়ে ওপেন সোর্স ইনভেস্টিগেশন ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট (OSINT) বা মুক্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব অনুসন্ধানের পরিধি বাড়াতে হবে। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, কল রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে একটি নিখুঁত স্বাধীন টাইমলাইন বা সময়রেখা দাঁড় করানো যায়, যা পুলিশি গল্পের সাথে বাস্তব সময়ের ব্যবধানগুলো ধরিয়ে দেবে। এই সমস্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকরা প্রথাগত ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রেস নোটের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা হোয়াইট পেপার প্রকাশ করতে পারেন, যেখানে প্রতিটি পুলিশি দাবির বিপরীতে অকাট্য যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক কাউন্টার আর্গুমেন্ট দিয়ে সত্যের দেওয়াল শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে।


এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রপক্ষ বা পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করতে পারে এবং এটাই আইনি স্বাভাবিক নিয়ম। এর মূল কারণ হলো, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের চার সদস্যই নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। ফলে মরদেহগুলো দাফন বা মামলা করার মতো তাৎক্ষণিক কোনো প্রত্যক্ষ স্বজন বা উত্তরসূরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, যখন কোনো গুরুতর অপরাধ বা চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বাদী হওয়ার মতো সরাসরি কোনো ব্যক্তি থাকে না, তখন রাষ্ট্র তথা সমাজের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। এটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক আইনি দায়িত্ব। রাষ্ট্র বাদী হয়ে মামলা করার পরের আসল লড়াইটি হলো সেই মামলাকে প্রভাবমুক্ত রাখা, আদালতের নজরদারি নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজি ছাড়াই প্রকৃত খুনিদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। অন্যথায়, এই মামলা কেবল কাগজ-কলমের একটি ফাইলে পরিণত হয়ে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

লেখক: 

সাজিদ সামী চৌধুরী

সাংবাদিক, লেখক, চিন্তক ও গবেষক।


Post a Comment

0 Comments