২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমের যাবতীয় আমলনামা

 


২০২৫ সালটি দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এবং এর কৃতিত্বের সিংহভাগ দাবি করতে পারে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো। তথ্য এবং প্রমাণের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে সাংবাদিকতাকে কীভাবে স্রেফ সৃজনশীল কল্পকাহিনী এবং উচ্চাভিলাষী রূপকথার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় তা তারা গত এক বছরে সাফল্যের সঙ্গে প্রদর্শন করেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো যে পরিমাণ রোমাঞ্চকর স্ক্রিপ্ট লিখেছে তা বলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমাকেও হার মানাতে বাধ্য। এই আলোচনায় আমি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছি কীভাবে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো সত্যকে পাশ কাটিয়ে এক সমান্তরাল বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে একজন সাধারণ মুসলিম বাবা রাতারাতি হিন্দু হয়ে যান কিংবা একটি সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ পরিণত হয় পারমাণবিক ধ্বংসলীলার কারিগর হিসেবে।



২০২৫ সালের এই প্রোপাগান্ডা উৎসবের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার সেই অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। শেখ হাসিনা যখন ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিলেন তখন থেকেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের সৃজনশীল কলম সচল করে তোলে। রিউমার স্ক্যানার এবং বাংলাফ্যাক্টের মতো তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী এই গুজব ছড়ানোর প্রতিযোগিতায় অন্তত ৪৯টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। এই দৌড়ে সবার আগে ছিল রিপাবলিক বাংলা যারা একাই পাঁচটি বড় বড় গুজব উপহার দিয়েছে আর তাদের ঠিক পেছনেই ছিল হিন্দুস্তান টাইমস, জি নিউজ এবং লাইভ মিন্টের মতো নামী প্রতিষ্ঠানগুলো যারা প্রত্যেকে অন্তত তিনটি করে কাল্পনিক সংবাদ প্রচার করেছে। এই সংবাদগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তারা কেবল ভুল তথ্য দেয়নি বরং এক ধরণের সাম্প্রদায়িক সুরসুরি এবং অস্থিতিশীলতা তৈরির সমন্বিত চেষ্টা চালিয়েছে যা সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন উদাহরণ।



এই কাল্পনিক গল্পের প্রথম অধ্যায় শুরু হয় শেখ হাসিনার তথাকথিত খোলা চিঠি দিয়ে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো দাবি করল যে শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে বাংলাদেশের মানুষের উদ্দেশ্যে একটি আবেগঘন চিঠি লিখেছেন যেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো সেন্ট মার্টিন দ্বীপ না দেওয়ায় তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরা ভবিষ্যৎ নামক একটি অখ্যাত পত্রিকা থেকে শুরু হয়ে এই গল্প দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো ইন্ডিয়া টুডে এবং রিপাবলিক টিভির মতো চ্যানেলে। অথচ পরে জানা গেলো এমন কোনো চিঠির অস্তিত্বই নেই এবং শেখ হাসিনা নিজে এমন কোনো বিবৃতি দেননি। এই যে একটি বানোয়াট ফেসবুক পোস্টকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তা কেবল ভারতীয় মিডিয়ার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। তারা এই গল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে আমেরিকার প্রতি ঘৃণা এবং হাসিনার প্রতি সহানুভূতি তৈরির এক করুণ চেষ্টা চালিয়েছিলো যা শেষ পর্যন্ত হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে।



কল্পনার সীমানা আরও বিস্তৃত হলো যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে তারা নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন দেওয়া শুরু করল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ড. ইউনূস ছিলেন তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। মাঝেমধ্যেই খবর আসছিল তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন। তারা প্রমাণ হিসেবে একটি ছবি ব্যবহার করল যেখানে দেখা যাচ্ছিল একজন রোগী হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন কিন্তু সেই ছবিতে থাকা ব্যক্তির চেহারার সঙ্গে ড. ইউনূসের কোনো মিলই ছিল না। শুধু অসুস্থতাই নয় ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মার্কিন নির্বাচনে জয়ী হলেন তখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করে বসল যে ড. ইউনূস ভয়ে ফ্রান্সে পালিয়ে গিয়েছেন। তারা ড. ইউনূসের বিমানে ওঠার একটি ছবি দেখিয়ে দাবি করল তিনি দেশ ছাড়ছেন অথচ সেই ছবিটি ছিল ৮ আগস্টের যখন তিনি ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশে শপথ নিতে ফিরছিলেন। সময়ের এই যে চমৎকার গোলকধাঁধা যেখানে ভবিষ্যতের পালানোকে অতীতের ফেরার ছবি দিয়ে প্রমাণ করা হয় তা ভারতীয় সাংবাদিকতার এক অনন্য ব্যাকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।



২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত এবং ট্র্যাজিক-কমেডি ঘরানার গুজবটি ছিল বাবুল হাওলাদারকে নিয়ে। বাংলাদেশের একজন অসহায় বাবা তার নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে মানববন্ধন করছেন কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সেই ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করল যে একজন হিন্দু ব্যক্তি তার ওপর হওয়া নির্যাতনের বিচার চাইছেন। বাবুল হাওলাদারকে তারা রাতারাতি অন্য ধর্মের মানুষ বানিয়ে দিল এবং তার ব্যক্তিগত শোককে সাম্প্রদায়িক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলো। এই ধরনের ধর্মীয় রূপান্তরের অলৌকিক ঘটনা ভারতীয় মিডিয়ার পর্দায় প্রায়ই দেখা গেছে। যেমন বাংলাদেশে কোনো মন্দিরে প্রতিমা বিসর্জনের ভিডিওকে তারা প্রচার করেছে মন্দির ভাঙচুরের দৃশ্য হিসেবে। সত্যের চেয়ে ভিউ এবং লাইক যাদের কাছে বড় তাদের জন্য এই ধরণের বিকৃতি ছিল একটি নিয়মিত কৌশল। ব্ল্যাকবার্ড এআই-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এই ধরণের প্রচারণা চালাতে নির্দিষ্ট কিছু হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে যেমন সেভ বাংলাদেশি হিন্দুস কিংবা হিন্দু জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ যা মূলত একটি পরিকল্পিত ন্যারেটিভ অ্যাটাকের অংশ ছিলো।



২০২৫ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দরে যখন একটি পাকিস্তানি জাহাজ নোঙর করল তখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সৃজনশীলতা এক তুঙ্গে পৌঁছালো। তারা দাবি করলো ১৯৭১ সালের সেই কুখ্যাত 'সোয়াত' জাহাজটিই ছদ্মবেশে আবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছে এবং এতে করে পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র আনা হচ্ছে। তারা দাবি করলো এই জাহাজটি সরাসরি করাচি থেকে এসেছে এবং এর ভেতরে আছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করার মতো ভয়ংকর সব সরঞ্জাম। অথচ শিপিং তথ্যানুযায়ী জাহাজটির নাম ছিল ‘এমভি ইউয়ান শিয়াং ফা ঝান’ যা ছিল একটি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং এটি স্রেফ শিল্প কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য নিয়ে এসেছিলো। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই জাহাজ বিষয়ক ফ্যান্টাসি এতটাই প্রবল ছিল যে তারা একটি পণ্যবাহী ট্রলারকেও মনে মনে ডেস্ট্রয়ার বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ভেবে শিউরে উঠেছিলো। তাদের এই অমূলক ভীতি প্রচারের ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে অহেতুক তিক্ততা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যা দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর বলে মনে হয়েছে।



সামরিক অভ্যুত্থানের দিবা স্বপ্ন দেখা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আরেকটি প্রিয় শখ ছিলো। দ্য ইকোনমিক টাইমস এবং ইন্ডিয়া টুডে-র মতো বড় বড় হাউজগুলো ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ঘটা করে প্রচার করল যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে এবং চেইন অফ কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। তারা এমনকি কিছু সিনিয়র জেনারেলের নাম উল্লেখ করে দাবি করলো যে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আইএসপিআর যখন বিবৃতি দিয়ে জানালো যে এই সংবাদগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধ আছে তখন ভারতীয় মিডিয়া সেই বিবৃতিকে উপেক্ষা করে তাদের কাল্পনিক গালগল্প চালিয়ই গেলো। তাদের কাছে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের কোথাও পরিদর্শনে যাওয়া কিংবা সাধারণ কোনো রদবদলও একটি মহাপ্রলয়ের সংকেত। এই ধরণের প্রোপাগান্ডা মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি বড় মাপের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।



ভৌগোলিক সীমানা নিয়েও ভারতীয় মিডিয়ার কল্পনা ছিল দেখার মতো। মে মাসে তারা এক অদ্ভুত খবর প্রচার করল যে তুরস্কের একটি এনজিও নাকি 'গ্রেটার বাংলাদেশ' এর একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের কিছু অংশ বাংলাদেশের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তারা আরও দাবি করলো যে সুলতানত-এ-বাংলা নামের একটি মৌলবাদী সংগঠন এই ম্যাপের প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু বাংলাফ্যাক্টের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল এক অবিশ্বাস্য সত্য। সেই ম্যাপটি আসলে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রাচীন বাংলার সুলতানি আমলের ঐতিহাসিক ম্যাপ। ইতিহাসের একটি প্রদর্শনীকে ভবিষ্যতের সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করার এই যে অসম্ভব প্রতিভা তা কেবল গদি মিডিয়ার পক্ষেই সম্ভব। তারা এই ম্যাপের গল্প দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করতে চেয়েছিল এবং অনুপ্রবেশের ইস্যুটিকে উসকে দিতে চেয়েছিলো।



২০২৫ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার গল্পগুলোও ছিল দারুণ সুনিপুণভাবে সাজানো। যখন চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হলেন তখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রচার করল যে তিনি চিন্ময় দাসের আইনজীবী ছিলেন এবং তাকে মুসলিমরা হত্যা করেছে । অথচ সাইফুল ইসলাম ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং তিনি কোনোভাবেই চিন্ময় দাসের পক্ষে কাজ করছিলেন না। শুধু তাই নয় রামন রায় নামে অন্য একজন ব্যক্তির ছবি হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অবস্থায় প্রচার করে বলা হলো যে তিনি চিন্ময় দাসের আইনজীবী এবং তার বাড়িতে হামলা হয়েছে। পরে জানা গেল রামন রায় কোনো আইনজীবীই নন এবং তার বাড়িতে হামলার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এই যে মৃত এবং আহত মানুষদের পরিচয় বদলে ফেলা এবং তাদের রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা এটি ছিল ২০২৫ সালের ভারতীয় সাংবাদিকতার এক অন্ধকার দিক। তাদের এই ধরণের মিথ্যাচারের ফলে আগরতলায় বাংলাদেশের মিশনে হামলা চালানো হয়েছিল যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন।



২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই মিথ্যাচারের ভয়াবহতা ফুটে ওঠে। রিউমার স্ক্যানার সেই মাসে ২৯৬টি ভুয়া খবর শনাক্ত করে যার সিংহভাগই ছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশ খবরই ছিল নেতিবাচক প্রচারণার অংশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে এক মাসেই ২৯টি বড় গুজব ছড়ানো হয়েছে যা একটি রেকর্ড। এছাড়া সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আসিফ মাহমুদ এবং নাহিদ ইসলামকে নিয়েও ছিল একের পর এক কাল্পনিক সংবাদ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এমনভাবে খবরগুলো পরিবেশন করছিল যেন বাংলাদেশ একটি নরকে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। অথচ ফ্রিডম হাউসের ২০২৫ সালের রিপোর্টে দেখা গেছে যে বাংলাদেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। এই বিপরীতমুখী চিত্রই প্রমাণ করে যে ভারতীয় মিডিয়া সত্য প্রচারের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রোপাগান্ডা এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী ছিলো।



সেপ্টেম্বর মাসে যখন দুর্গাপূজা এলো তখন ভারতীয় মিডিয়ার মূল অস্ত্র হয়ে উঠল ইলিশ মাছ। প্রথমে তারা খবর ছড়ালো যে বাংলাদেশের নতুন সরকার ইলিশ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে কারণ তারা ভারতকে ঘৃণা করে। যখন বাংলাদেশ সরকার ১২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিল তখন তারা সুর বদলে বলল যে ‘ভারত সরকারের চাপের মুখে পড়ে ইউনূস সরকার নতি স্বীকার করেছে।’ মানে হাসবো না কাঁদবো নাকি কেঁদে হাসবো? ইলিশ মাছকে তারা এমনভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাল যেন এটি কোনো মাছ নয় বরং একটি পারমাণবিক অস্ত্র। এমনকি বাংলাদেশে ইলিশের দাম কেন বেশি আর ভারতে কেন সস্তা তা নিয়েও তারা অদ্ভুত সব তত্ত্ব হাজির করলো। 


মাছের মতো একটি সাধারণ বিষয়কে কূটনৈতিক যুদ্ধের অংশ বানিয়ে ফেলা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সৃজনশীলতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। তাদের কাছে প্রতিটি ইলিশের আশ ছিল যেন একেকটি সাম্প্রদায়িক স্লোগান।



বছরের শেষদিকে যখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরলেন তখন ভারতীয় গণমাধ্যম এবিপি আনন্দ এক অকল্পনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসলো। তারেক রহমান তার বক্তৃতায় মার্টিন লুথার কিং-এর সেই বিখ্যাত বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' বা আমার একটি পরিকল্পনা আছে যা তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য করতে চান। কিন্তু এবিপি আনন্দ তাদের হেডলাইনে লিখল যে তারেক রহমানের এই পরিকল্পনা আসলে 'ভারত নিয়ে পরিকল্পনা'। পুরো বক্তৃতায় তিনি একবারও ভারতের নাম উচ্চারণ না করলেও হেডলাইনে ভারতকে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো যেন তিনি দেশে ফিরেই ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এই যে শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করা এবং প্রাসঙ্গিকতাকে বিসর্জন দেওয়া এটিই ছিল ২০২৫ সালের গদি মিডিয়ার সিগনেচার স্টাইল।



একই সময়ে ছাত্র নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়া আরও একটি নাটক মঞ্চস্থ করল। তারা একটি ছবি প্রচার করে দাবি করল যে বাংলাদেশে 'ইন্ডিয়া আউট' প্রচারণা তুঙ্গে এবং একজন প্রতিবাদকারীকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারা দাবি করলো সেই প্রতিবাদকারী আইসিইউতে মৃত্যুশয্যায়। পরবর্তীতে বুম লাইভ অনুসন্ধান করে দেখে যে সেই ছবিটি ছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির এবং যে ব্যক্তিকে ট্রাক চাপা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে তিনি আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় তারেক রহমান (আমজনতার পার্টির নেতা) যিনি সেই সময়ে বহাল তবিয়তে ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। অর্থাৎ যে মানুষটি সুস্থভাবে ক্যামেরার সামনে কথা বলছেন তাকে ভারতীয় মিডিয়া মৃতপ্রায় রোগী বানিয়ে দিল। এই ধরণের জাদুকরী সাংবাদিকতা কেবল ভারতের টিভি চ্যানেলগুলোতেই সম্ভব যেখানে বেঁচে থাকা মানুষকে মৃত এবং সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানানো কোনো ব্যাপারই না।



২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ একটি গোলটেবিল আলোচনায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই অপপ্রচারের ভয়াবহতা নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন যে এটি কোনো সাধারণ ভুল নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা সুসংগঠিত প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ। ভারত রাষ্ট্র হিসেবে এই গুজবের পেছনে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে এবং তারা পরিকল্পিতভাবে ইংরেজি ভাষায় এই মিথ্যাগুলো প্রচার করছে যাতে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ছড়ানো অপতথ্যের ৭২ শতাংশই ছিল ভারত ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একাউন্ট থেকে আসা। এই একাউন্টগুলো থেকে ছড়ানো খবরগুলো ১৫ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে যা মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ তৈরি করেছে। এটি ছিলো একটি অসম যুদ্ধ কারণ একটি মিথ্যা ছড়াতে কয়েক সেকেন্ড লাগে কিন্তু তা মিথ্যা প্রমাণ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়।



ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই কাল্পনিক মহাকাব্যে আরও ছিল উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের একটি ভুয়া ভিডিও। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল যোগী আদিত্যনাথ মোদির পদত্যাগ দাবি করছেন কারণ তিনি বাংলাদেশে হামলা চালাচ্ছেন না। যদিও পরে জানা গেল এই ভিডিওটি কারসাজি করা এবং যোগী আদিত্যনাথ এমন কোনো দাবি করেননি কিন্তু ভিডিওটি ভারতীয় নেটওয়ার্কগুলোতে কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে যা এক ধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং যুদ্ধের উসকানি হিসেবে কাজ করেছে। সত্যের সঙ্গে মিথ্যার এই যে জটিল মিশ্রণ যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং হিংসা ছড়িয়ে দেয় তা ২০২৫ সালের দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভারতীয় মিডিয়া এই সংকটের আগুনে ঘি ঢালার কাজটি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করেছে।



যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ সতর্কতা নিয়েও ভারতীয় মিডিয়া এক চমৎকার মশকরা করেছে। তারা প্রচার করল যে বাংলাদেশের পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় যুক্তরাজ্য কেবল বাংলাদেশের জন্যই বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে এবং যে কোনো সময় সেখানে বড় ধরণের হামলা হতে পারে। অথচ সেই সতর্কবার্তায় ভারতের নামও ছিল এবং এটি ছিল একটি রুটিন আপডেট যা ফ্রান্স, স্পেন কিংবা জার্মানির মতো দেশগুলোর জন্য দেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় মিডিয়া এমনভাবে খবরটি পরিবেশন করল যেন কেবল বাংলাদেশেই প্রলয় শুরু হচ্ছে আর বাকি পৃথিবী স্বর্গে আছে। তাদের এই ধরণের খণ্ডিত সত্য প্রচারের ফলে বাংলাদেশের পর্যটন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি কারণ সত্য চিরকাল চাপা থাকে না।

২০২৫ সালের এই দীর্ঘ গুজবের তালিকায় আরও একটি হাস্যকর সংযোজন ছিল বাংলাদেশের বিমান ঘাঁটি নিয়ে। ভারতীয় মিডিয়া দাবি করল যে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী নাকি চীনের কারিগরি সহায়তায় ভারতের 'চিকেন নেক' বা শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমান ঘাঁটি তৈরি করছে। তারা দাবি করল এই ঘাঁটি থেকে সরাসরি ভারতে হামলা চালানো হবে। অথচ রিউমার স্ক্যানার এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখলেন যে এমন কোনো প্রকল্পের অস্তিত্বই নেই এবং এটি ছিল স্রেফ একটি কল্পনাপ্রসূত গল্প।  



এই গল্পের মাধ্যমে তারা ভারতের সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার ভয় ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিল এবং বাংলাদেশকে চীনের একটি উপগ্রহ রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল। সাংবাদিকতার নামে এই ধরণের রণকৌশলগত অপপ্রচার মূলত দুই দেশের সম্পর্কের মূলে কুঠারাঘাত করার শামিল। 



ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই সৃজনশীলতার উৎস ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ধর্মীয় মেরুকরণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের নির্বাচন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ১১৪টি রাজনৈতিক ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছে যা মোট গুজবের ৪২ শতাংশ। এই খবরগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রমাণ করা যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো শক্তি ক্ষমতায় থাকা মানেই হলো মৌলবাদের উত্থান। এই ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার জন্য তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সব কিছুকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করেছে। ডিসমিসল্যাবের রিপোর্টে দেখা গেছে যে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ভুয়া খবরের হার আগের বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে যার একটি বড় অংশ এসেছে সীমান্ত পার থেকে। এই প্রোপাগান্ডা মেশিনের চাকা এত দ্রুত ঘুরছিলো যে তারা নিজেরাই নিজেদের মিথ্যাগুলো মনে রাখতে পারছিলো না যার ফলে প্রায়ই তারা স্ববিরোধী সংবাদ পরিবেশন করতো।



২০২৫ সালের এই গুজব যুদ্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার। ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভারতীয় একাউন্টগুলো থেকে যেভাবে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে তা আন্তর্জাতিক সাইবার আইনের পরিপন্থী। রিউমার স্ক্যানার এপ্রিল মাসে ২৭৬টি ফেসবুক পোস্ট এবং ৪৪টি এক্স পোস্ট শনাক্ত করে যা ছিল সরাসরি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা। 



এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে তারা ভুয়া ফটোকার্ড এবং নামী সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে মিথ্যা খবর ছড়িয়ে দিত যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বিশ্বাস করে। এমনকি তারা বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে এমন সব খবর ছাপাত যা ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক। এই ধরণের সাইবার অ্যাটাক মূলত একটি দেশকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার একটি আধুনিক যুদ্ধকৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায় যে ২০২৫ সালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতাকে এমন এক স্তরে নিয়ে গেছে যেখানে সত্যের কোনো স্থান নেই বরং আছে কেবল সস্তা বিনোদন এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা। তাদের পরিবেশিত প্রতিটি খবরই ছিল একেকটি রূপকথা যা তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রচার করেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং তরুণ সমাজ এই প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে যে লড়াই করেছে তা প্রশংসার দাবিদার। সত্যের চেয়ে গুজব যে অনেক বেশি গতিশীল তা ভারতীয় মিডিয়া প্রমাণ করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যই জয়ী হয় তা ২০২৫ সালের ঘটনাবলি থেকে পরিষ্কার হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই সৃজনশীল মহাকাব্য ভবিষ্যতে হয়তো ফিকশন রাইটারদের জন্য দারুণ রসদ যোগাবে কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকতার ইতিহাসের পাতায় এটি একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে। তাদের এই গুজব উৎসব মূলত প্রতিবেশী দেশের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির এক করুণ প্রতিফলন যা কেবল ঘৃণাই বাড়িয়েছে কোনো সমাধান দেয়নি। সত্য যখন প্রকাশিত হয় তখন এই ধরনের কাল্পনিক সংবাদগুলো কেবল হাসির খোরাক হিসেবেই টিকে থাকে এবং ২০২৫ সালের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।



ভারতীয় গণমাধ্যমের এই প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের প্রভাব কেবল বাংলাদেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং এটি ভারতের নিজের গণতন্ত্রের জন্যও ছিল এক বড় হুমকি। যখন একটি দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেশী দেশের প্রতিটি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রঙে রঞ্জিত করে তখন সেই দেশের নিজের মানুষের মধ্যেও গোঁড়ামি এবং অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আগরতলায় যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল তা মূলত ভারতীয় মিডিয়ার বছরের পর বছর ধরে চালানো বিষবাষ্পের ফলাফল। তারা বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে 'জিহাদি বিপ্লব' হিসেবে প্রচার করে আন্তর্জাতিক মহলে যে নেতিবাচক বার্তা দিতে চেয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই তলানিতে নামিয়ে এনেছে। 



ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন বিশ্বসমাদৃত নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদকে নিয়ে যেভাবে তারা সস্তা ট্রল এবং গুজব ছড়িয়েছে তা বিশ্ববাসীর কাছে ভারতের ভাবমূর্তিকে সংকীর্ণ করে তুলেছে। 



একইভাবে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মতো একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে তারা যেভাবে বিকৃত করেছে তা পেশাদারিত্বের সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছে। তারেক রহমান যেখানে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের কথা বলছেন সেখানে ভারতীয় মিডিয়া তাকে ভারতের শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য তার বক্তৃতার ভুল ব্যাখ্যা হাজির করেছে। এই ধরণের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে ভারতীয় নীতিনির্ধারক এবং তাদের অনুগত মিডিয়া এখনো বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা এখনো ঢাকাকে তাদের একটি করদ রাজ্য হিসেবে দেখতে চায় আর যখনই বাংলাদেশের মানুষ তাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়ার চেষ্টা করে তখনই ভারতের মিডিয়া প্রোপাগান্ডা মেশিন সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০২৫ সাল ছিল এই মানসিকতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।



তবে আশার কথা হলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলো এই বিশাল প্রোপাগান্ডা পাহাড়কে ধসিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। রিউমার স্ক্যানার, বাংলাফ্যাক্ট এবং ডিসমিসল্যাবের মতো সংস্থাগুলো প্রতিটি গুজবকে যেভাবে সময়মতো এবং তথ্য দিয়ে মোকাবিলা করেছে তা বিশ্বের যে কোনো দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ইংরেজি এবং বাংলায় যেভাবে সত্য প্রচার করেছে তাতে ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচারগুলো খুব বেশিক্ষণ টেকেনি। এই যে তথ্যের লড়াই যেখানে স্রেফ সত্যি কথা বলে একটি বড় প্রতিবেশী দেশের প্রোপাগান্ডাকে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে তা ২০২৫ সালের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। ভারতীয় মিডিয়া হয়ত আরও অনেক রূপকথা তৈরি করবে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখন জানে কীভাবে সেই রূপকথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে খুঁজে বের করতে হয়।



উপসংহারে বলি, ২০২৫ সালের ভারতীয় মিডিয়ার এই বাংলাদেশ বিরোধী অভিযান ছিল সাংবাদিকতার এক বিরাট পতন। তারা তথ্যের চেয়ে তত্ত্বকে এবং সংবাদের চেয়ে সাজানো গল্পকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ইলিশ মাছ থেকে শুরু করে বিমান ঘাঁটি আর বাবুল হাওলাদার থেকে আমজনতা পার্টির তারেক রহমান পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়কেই তারা তাদের সৃজনশীল মিথ্যার চাদরে ঢেকে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবের কঠিন মাটিতে সেই সব মিথ্যার প্রাসাদ বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়েছে। ২০২৫ সালের এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাংবাদিকতা যখন স্রেফ প্রোপাগান্ডায় রূপ নেয় তখন তা আর জনহিতকর থাকে না বরং তা সমাজে কেবল অস্থিরতা এবং ঘৃণাই তৈরি করে। 



ভারতীয় মিডিয়ার এই গুজবের মহাকাব্য ইতিহাসের পাতায় এক বিদ্রূপের বিষয় হিসেবেই থেকে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ এই গুজব যুদ্ধ থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে এবং তারা প্রমাণ করেছে যে সত্যের শক্তি যে কোনো সুসংগঠিত মিথ্যার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ২০২৫ সালের এই রূপকথার পরিসমাপ্তি এভাবেই হয়েছে যেখানে সত্যের আলোয় ভারতীয় মিডিয়ার সব সৃজনশীল গুজব মিলিয়ে গেছে।



অসমাপ্ত গল্পের মতো ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর এই উদ্ভাবনী ক্ষমতা ভবিষ্যতে আরও কী কী নতুন গুজব জন্ম দেবে তা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এখন আর উদ্বেগ নেই বরং এক ধরণের কৌতুক মিশ্রিত কৌতূহল আছে। প্রতিটি নতুন খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন প্রথমেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে এতে ভারতীয় মিডিয়া কোন নতুন টুইস্ট যোগ করেছে। ২০২৫ সালের এই অভিজ্ঞতা আমাদের সাংবাদিকতার এক বিকল্প পাঠ দিয়েছে যা কোনো পাঠ্যপুস্তকে পাওয়া সম্ভব নয়। ভারতীয় মিডিয়ার এই প্রোপাগান্ডা মেশিন এখন এক ধরণের অটোমেটেড কারখানায় পরিণত হয়েছে যেখানে প্রতিদিন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নতুন নতুন স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়। কিন্তু সত্যের দেয়াল এতটাই শক্ত যে এই সব কাল্পনিক তলোয়ার দিয়ে সেই দেয়ালে একটি আঁচড়ও কাটা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের এই গুজব পুরাণ শেষ পর্যন্ত কেবল ভারতীয় মিডিয়ার দৈন্য দশাকেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। সত্যের জয় চিরন্তন আর ২০২৫ সালের বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তা অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। সত্য প্রকাশিত হয়েছে আর মিথ্যার এই সৃজনশীল উৎসব অন্ধকারেই হারিয়ে গেছে।


তথ্যসূত্র:

১. 49 Indian media outlets run 13 false reports on Bangladesh: Rumor Scanner, 

২. বাংলাদেশ নিয়ে ভুয়া খবর ভারতের ৪৯ গণমাধ্যমে - দেশ রূপান্তর, 

৩. 72pc accounts spreading anti-Bangladesh misinformation located in India: Rumor Scanner | News,

৪. Indian media's propaganda against Bangladesh under a ... - BSS,

৫. Indian Media's Misinformation Fuels Hate at Home and Across Borders, 

৬. India Narrative Attacks Aims to Sow Division in Bangladesh Following Ousting of Prime Minister - Blackbird.AI,

৭. Indian media outlets' report about 'Greater Bangladesh Map' is fake: BanglaFact

Post a Comment

0 Comments