বসন্তের আগমনি বার্তার আগেই বন্দরনগরীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় বসলো ‘গণবিবাহ’ সদৃশ এক অদ্ভুত আসর। শাড়ি আর পাঞ্জাবির প্রথম অক্ষর নিয়ে তৈরিকৃত ‘শাপা ডে’ নামক এক ইভেন্টকে কেন্দ্র করে আজ সারাদিনব্যাপী সেই ক্যাম্পাসে যে সাজসজ্জার মহড়া চলল, তাকে অনেকেই ‘ঐতিহ্যের সস্তা মলাট’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এই উৎসবের জৌলুস ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে অন্য একটি প্রশ্ন, আমাদের উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠগুলো কি এখন সৃজনশীলতা বাদ দিয়ে অন্যের ঘর থেকে ‘আইডিয়া’ চুরির কারখানায় পরিণত হয়েছে?
ভাষাবিদদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ‘শাড়ি’ ও ‘পাঞ্জাবি’কে জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘শাপা’ শব্দটি। অনেকেই বলছেন, শাড়ি আর পাঞ্জাবির এমন বিদঘুটে সন্ধিবিচ্ছেদ দেখে পাণিনি বা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বেঁচে থাকলে নির্ঘাত গলায় দড়ি দিতেন। এগুলো কেবল একটি শব্দের অপমৃত্যু নয়, বরং ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক রুচির চরম দেউলিয়াত্ব। সচেতন শিক্ষার্থীরা কৌতুক করে বলছেন, ‘শাপা’ যদি আজ স্বীকৃতি পায়, তবে ভবিষ্যতে লুঙ্গি আর ফতুয়ার প্রজননে ‘লুফো ডে’ দেখা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘শাপা ডে’ নামক এই কনসেপ্টটি মূলত পার্শ্ববর্তী অন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি) উদ্ভাবিত একটি ইভেন্ট। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব যখন নিজের মেধা ব্যবহার না করে সরাসরি অন্যের ঘরের আইডিয়া চুরি করে নিজেদের নামে চালায়, তখন তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক চৌর্যবৃত্তি বা ‘Plagiarism’ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে? প্রযুক্তির ছাত্র হয়েও যারা একটি স্বতন্ত্র নাম কিংবা মৌলিক থিম দাঁড় করাতে অক্ষম, তাদের হাতে আমাদের আগামীর উদ্ভাবন কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্ন এখন তুঙ্গে।
বাংলার নারীর প্রধান পরিচয়বাহী পোশাক শাড়ি। এই পোশাকের প্রাচীনত্বের প্রমাণ মেলে আমাদের প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদে। আনুমানিক দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা যে পদগুলো রচনা করেছিলেন, সেখানে তৎকালীন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি সুতি বস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন ভাস্কর্য এবং পোড়ামাটির ফলকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অঞ্চলের নারীরা প্রাচীনকালে সেলাইবিহীন এক টুকরো দীর্ঘ কাপড় জড়িয়ে শরীর ঢাকতেন। চর্যাপদের যুগে লুইপা বা কুক্কুরীপার রচনায় সাধারণ মানুষের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে পোশাকের অতি সাধারণ রূপটিই প্রধান ছিলো।
প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্যগুলোতে দেখা যায়, শাড়ি আজকের মতো কাঁধে আঁচল তুলে পরার চল ছিল না। সে সময় মহিলারা শরীরের নিচের অংশে কাপড় জড়িয়ে রাখতেন এবং উপরের অংশে অনেক সময় কোনো অতিরিক্ত বস্ত্র থাকতো না, অথবা কেবল একটি সরু উত্তরীয় ব্যবহার করা হতো। এই রীতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে মধ্যযুগে এবং চূড়ান্ত আধুনিকতা পায় উনিশ শতকের শেষার্ধে। বঙ্গের শাড়িকে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল মসলিন ও জামদানি। ‘মসলিন’ শব্দটি ইরাকের মসুল শহর থেকে এলেও ঢাকার মসলিন ছিল মানের দিক থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। অতি সূক্ষ্ম সুতায় তৈরি এই বস্ত্রটি এতই পাতলা ছিল যে, ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ শাড়ি অনায়াসে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেতো। এই বিস্ময়কর কাপড়ের উত্তরসূরি হলো জামদানি। জামদানি মূলত একটি ফার্সি শব্দ, যেখানে ‘জাম’ মানে ফুল এবং ‘দানি’ মানে ধারক। বাংলার এই তাঁত শিল্প ব্রিটিশ আমলের নীলকর ও শোষকদের অত্যাচারে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে জামদানি তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করছে ।
শাড়ি পরার আজকের যে স্টাইল আমরা ক্যাম্পাসের ছাত্রীদের মধ্যে দেখি, অর্থাৎ কুঁচি দিয়ে বাম কাঁধে আঁচল তুলে দেওয়া, তার প্রবর্তক ছিলেন ঠাকুরবাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। উনিশ শতকের আগে বাঙালি নারীরা শাড়ির নিচে ব্লাউজ বা পেটিকোট পরার কথা কল্পনাও করতে পারতেন না। তখন এক প্যাঁচে শাড়ি পরাই ছিল নিয়ম এবং সেলাই করা কাপড় পরাকে অনেকে অশুভ মনে করতেন। ১৮৭১ সালে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন তার স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মস্থল বোম্বাইয়ে (মুম্বাই) যান, তখন তিনি লক্ষ্য করেন যে পারসি নারীদের শাড়ি পরার ধরন অত্যন্ত মার্জিত এবং চলাফেরার জন্য সুবিধাজনক। তিনি পারসি স্টাইলের সাথে নিজের সৃজনশীলতা মিশিয়ে ‘বোম্বাই দস্তুর’ বা ‘ব্রাহ্মিকা স্টাইল’ প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে কুচবিহারের মহারানি সুনীতি দেবী শাড়ির আঁচল কাঁধের সাথে আটকে রাখার জন্য ব্রুচের ব্যবহার শুরু করেন, যা আভিজাত্যের নতুন মাত্রা যোগ করে।
কিন্তু, পাঞ্জাবি বা কুর্তা বাঙালির ভূমিজ পোশাক নয়, বরং এটি পারস্য ও মধ্য এশিয়ার প্রভাবের একটি অনন্য উদাহরণ। পাঞ্জাবি শব্দটি মূলত ‘পাঞ্জাব’ অঞ্চলের নাম থেকে এসেছে। ধারণা করা হয়, পাঞ্জাব অঞ্চলের লোকেরা যে বিশেষ ধরণের লম্বা টিউনিক পরিধান করতেন, তা মুঘল ও তুর্কিদের মাধ্যমে সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলায় এসে ‘পাঞ্জাবি’ নামে স্থায়ী রূপ পায়। মুঘল আমলে কুর্তা বা কাবা (Qaba) ছিল দরবারি আভিজাত্যের প্রতীক। এটি মূলত পারস্যের ‘কুর্তাহ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ কলারবিহীন আলগা জামা। মধ্যযুগে অভিজাত মুসলমান ও সম্ভ্রান্ত হিন্দুরা এই পোশাকটিকে নিজেদের আভিজাত্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ আমলে এটি সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিগত ৩০০-৪০০ বছরে বাঙালির তাঁত ও কারুশিল্পীরা পাঞ্জাবিতে তাদের নিজস্ব কারুকাজ (যেমন: নকশিকাঁথা বা জামদানি বুটি) যোগ করে একে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন যে, এটি এখন বাঙালির সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শাড়ি ও পাঞ্জাবি যেমন ক্যাম্পাসের উৎসবে আভিজাত্য প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি লুঙ্গি আমাদের প্রান্তিক মানুষের ঐতিহ্যের প্রধান বাহক। মজার ব্যাপার হলো, লুঙ্গিও কিন্তু আদি বাঙালি পোশাক নয়। এটি এই অঞ্চলে এসেছে আরব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নাবিকদের মাধ্যমে। আরব অঞ্চলে লুঙ্গির মতো পোশাককে ‘ইজার’ বা ‘ফুতাহ’ বলা হয় । ইয়েমেনে একে ‘মাওয়াজ’ (Ma'awaj) বা ‘সারুন’ বলা হয়। মূলত বাণিজ্য পথে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া নাবিক ও ব্যবসায়ীরা চলাফেরার সুবিধার জন্য এই সেলাইহীন কাপড়টি ব্যবহার করতেন। দক্ষিণ এশিয়ায় লুঙ্গির জন্মস্থান হিসেবে বাংলার নাম এলেও এর শেকড় তামিল ‘ভেস্তি’ কাপড়ের সাথেও যুক্ত। বাঙালি পুরুষদের কাছে লুঙ্গি এখন আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের সমার্থক। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি তার মান ও নকশার জন্য বিশ্ববিখ্যাত এবং ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল এটি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের এই পোশাকটিও এখন জাতীয়ভাবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
চট্টগ্রামের আবহাওয়ার বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। এমন একটি ভ্যাপসা গরমের দিনে রেশম বা ভারী কারুকাজ করা পাঞ্জাবি আর শাড়ির কুঁচি সামলে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানোকে অনেকে ‘ফাস্যন-জিহাদ’ হিসেবে আখ্যা দিলেও, এটি মূলত বাস্তবতাবর্জিত ফ্যাশন প্রীতিরই নামান্তর। যে সময়ে শিক্ষার্থীরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষে গবেষণারত থাকার কথা, সে সময়ে তারা ঘামঝরানো দুপুরে স্রেফ আলোকচিত্রের ফ্রেমে বন্দি হওয়ার জন্য ভারী পোশাক পরে সময় অতিবাহিত করছে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য যেখানে হওয়া উচিত ছিল যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে জীবনকে সাজানো, সেখানে এই ধরণের কৃত্রিম উৎসবগুলো শিক্ষার্থীদের মুক্ত মানসিকতার বিকাশের বদলে প্রদর্শনবাদী করে তুলছে।
সংস্কৃতি কোনো স্থবির বিষয় নয় এবং বিবর্তন আসবেই; এ কথা সত্যি। কিন্তু বিবর্তনের নামে আমরা যদি ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটাই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র প্রাঙ্গণকে স্রেফ আলোকচিত্রের গ্যালারিতে পরিণত করি, তবে তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক ভুল বার্তা বহন করবে। কপি-পেস্ট সংস্কৃতি আর ভাষাগত অযত্ন একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।
হাজার বছরের বঙ্গীয় সংস্কৃতি আর কয়েকশ বছরের মুঘল-পার্সিয়ান ঐতিহ্যের ধারক শাড়ি ও পাঞ্জাবি। অথচ সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ ইতিহাসকে স্রেফ একটি ‘কপি করা’ ইভেন্টের মোড়কে বন্দী করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংস্কৃতির প্রতি টান নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা আর ফটো সেশনের জন্যই এই ‘সাজুগুজু’ উৎসবের আয়োজন। যারা প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে একটি সাধারণ এআই (AI) ব্যবহার করে মৌলিক কোনো ধারণা বের করতে পারেন না, তারাই আজ ঐতিহ্যের ধ্বজাধারী সেজে বসেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, "সংস্কৃতি কোনো বেচে দেওয়ার বা কপি করার জিনিস নয়। ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাবের মতো একটি জায়গা থেকে আমরা ইনোভেশন আশা করি, অন্যের ফেলে দেওয়া বাসি আইডিয়ার চর্বিতচর্বণ নয়। তারা ‘সোর্স কোড’ কপি করতে করতে কি এখন জীবনের সব 'আইডিয়া'ও কপি করার কন্ট্রাক্ট নিয়ে নিয়েছে? এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগনিটিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।"
আরেক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-র জানান, "বর্তমানে একটা ফ্রি টায়ার এআই-কে প্রম্পট দিলেও সে অন্তত ৪-৫টা সম্মানজনক নাম আর ইউনিক থিম বের করে দেয়। কিন্তু তাদের জন্য আমার করুণা হয়; কারণ তারা সম্ভবত এআই ব্যবহারেও ততটাই অপটু যতটা মৌলিক চিন্তায়। এআই অন্তত ডেটাবেস চেক করে, আর আপনারা চেক করলেন পাশের ক্যাম্পাসের জিনিস। প্রযুক্তির যুগে বাস করে এমন 'দিনে দুপুরে চুরি' করার জন্য আলাদা একটা সাহসের প্রয়োজন হয়, যেটা আপনাদের আছে। ভাবতেই অবাক লাগছে, এতো সাহস আমাদের হয় না কেনো?"
উৎসব মানেই যদি হয় অন্যের বুদ্ধি ধার করা, তবে সেই উৎসব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গৌরবের নয়, বরং লজ্জার। ‘শাপা’র এই হুজুগ শেষ হবে ঠিকই, কিন্তু ‘নকলবাজ’ হিসেবে যে তিলকটি আয়োজকদের কপালে লেগে গেল, তা ধুতে কতগুলো সাবান লাগবে; এখন সেই হিসাব কষছেন শিক্ষার্থীরা।

0 Comments